নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ | ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
দীর্ঘ ৩০টি বছর। যে বয়সে রাহেলা বেগম কারাগারে ঢুকেছিলেন, আজ তার শরীর নুয়ে পড়েছে বার্ধক্যে। নওগাঁ জেলা কারাগারের লোহার ফটক যখন আজ তার জন্য উন্মুক্ত হলো, তখন তার চুলে পাক ধরেছে, দৃষ্টি হয়েছে ঝাপসা। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকারে ফেলে আজ তিনি মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত
রাহেলা বেগমের এই দীর্ঘ কারাবাসের নেপথ্যে ছিল একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। ১৯৯৫ সালে নওগাঁর পত্নীতলা এলাকায় তার স্বামী আশরাফুল ইসলাম খুন হন। সেই সময় স্বামীকে হত্যার অভিযোগে রাহেলা বেগমকে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরও ১ বছরের জেল) প্রদান করেন।
৩০ বছরের দীর্ঘ কারাবাস
আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ পূর্ণ করতে রাহেলা বেগমকে দীর্ঘ তিন দশক কারাগারে কাটাতে হয়। সাজার মেয়াদ শেষ হলেও একটি ক্ষুদ্র বাধা তার মুক্তিকে দীর্ঘায়িত করছিল। সাজার সাথে থাকা ৫ হাজার ৫০০ টাকার জরিমানার অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য ছিল না নিঃস্ব এই বৃদ্ধার। ফলে সাজা শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত সময় তাকে কারাভোগ করতে হচ্ছিল।
এক মানবিক উদ্যোগ
রাহেলা বেগমের এই অসহায়ত্বের বিষয়টি নজরে আসে নওগাঁ জেলা কারাগারের জেল সুপার রত্না রায়ের। একজন অসহায় নারী হিসেবে তার এই করুণ পরিণতি দেখে জেল সুপার ব্যক্তিগতভাবে সেই জরিমানার অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব নেন। তার এই মানবিক উদ্যোগের ফলেই অবশেষে আইনি বাধা দূর হয় এবং রাহেলা বেগম মুক্তির স্বাদ পান।
মুক্তি পরবর্তী বাস্তবতা
কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে বের হওয়ার সময় রাহেলা বেগমের চোখে ছিল আনন্দ আর বিষাদের মিশ্র অশ্রু। ৩০ বছর আগে যে পৃথিবী তিনি ছেড়ে গিয়েছিলেন, আজকের এই আধুনিক পৃথিবীর সাথে তার পরিচয় নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ এই সময়ে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো স্বজন বা পরিবার অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে ৬৬ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার আশ্রয়ের ঠিকানা এখন এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনাটি একদিকে যেমন আইনের কঠোরতাকে মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে এক সরকারি কর্মকর্তার মানবিক দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজকে নতুন করে আশাবাদী করে তোলে।
